ওয়ারশর অতীত

0
18
ওল্ড টাউনের একটি ভাস্কর্য

সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি বাহিনী যার শুরুটা করেছিল পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ আক্রমণের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পর স্মৃতিবিজড়িত সেই শহরেই গিয়েছিলেন পর্যটক যাইদ যাকারিয়া [/button]

ওল্ড টাউনের একটি ভাস্কর্য

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর অধিবাসীরা দিনটি শুরু করেছিল অন্য যেকোনো দিনের মতোই। শহরের মুষ্টিমেয় ইহুদি ধর্মাবলম্বীর জন্য পরদিন শনিবার গুরুত্বপূর্ণ, চলছিল তার প্রস্তুতিও। পোল্যান্ডের মতোই এর আশপাশের দেশগুলোর নিরীহ মানুষেরা তখনো জানত না ইউরোপের মানচিত্রে বড় রকমের পরিবর্তন আসছে, দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই জার্মানির নাৎসি বাহিনী ওয়ারশে আকস্মিক বিমান হামলা শুরু করে আর এরই সঙ্গে শুরু হয় মানব ইতিহাসের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এক অধ্যায়ের, শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

সেই দিনটির প্রায় ৮০ বছর পর আমার ওয়ারশ ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। বলা হয়ে থাকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে শহরটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলো পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ। নাৎসিদের আক্রমণের পর থেকেই এই শহরের ওপর নেমে আসে আরেক বিভীষিকা, একে একে আলাদা করা হয় ইহুদি পরিবারগুলোকে, তারপর দেয়ালে ঘেরা ছোট্ট পরিসরে (যার নাম দেওয়া হয় ‘ইহুদি বস্তি’) এদের আটকে রেখে চলত অত্যাচার, আর এখান থেকেই বাসে ভরে ইহুদি পরিবারগুলোকে, বৃদ্ধ, শিশু, নারীনির্বিশেষে পাঠানো হতো বিভিন্ন বন্দিশিবিরে হত্যার জন্য। ধারণা করা হয়, ওয়ারশর ৪ লাখ ইহুদির সংখ্যা যুদ্ধ শেষে কয়েক হাজারে নেমে আসে, এত দুঃখ নিয়ে যে শহরের পুনর্জন্ম হয়েছে, তার প্রভাব চারদিকে থাকবে—এমন ভাবনা নিয়েই চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ থেকে ওয়ারশর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি।

দুবার ট্রেন বদল করে প্রায় ৯ ঘণ্টা ট্রেনযাত্রার পর ওয়ারশে পা দিয়ে আক্কেলগুড়ুম! এতটা চাকচিক্য দেখব ভাবিনি, রেলওয়ে স্টেশন থেকে বের হতেই লাগল প্রায় আধঘণ্টা, স্টেশনের ওপর তিনটি ফ্লোরজুড়ে শপিং মল, কী নেই সেখানে! পৃথিবীর জনপ্রিয় বড় বড় ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে নাম না জানা আরও অনেক ব্র্যান্ডের দোকান। উবারের জন্য অপেক্ষা করার সময় বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ‘হার্ড রক ক্যাফে’-এর একটা শাখাও দেখলাম, কম বয়সী ছেলেমেয়েরা ভিড় করে আছে। গাড়ির বাকি পথ আমি ও আমার স্ত্রী দুদিকের জানালা দিয়ে হাঁ করে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, আর যা হোক এমন চকচকে উঁচু উঁচু দালানের বিরামহীন মানুষের মিছিল আমরা আশা করিনি। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বুকের বাঁ পাশে একটু চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলাম এই ভেবে যে মাটিতে মিশে যাওয়া একটা শহর ৮০ বছরে এতটা উন্নতি করেছে।

পরের দিন ওয়ারশর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিঘেরা জায়গাগুলো দেখব বলে ঠিক করলাম। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি, প্রতিটি দেশ বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিসংবলিত জায়গাগুলো পরম মমতা নিয়ে সংরক্ষণ করে আসছে। এখানকার সরকার বিশেষ এই জায়গাগুলোতে ভ্রমণের জন্য কম বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়, স্কুল থেকে নিয়ম করে শিক্ষার্থীদের যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এসব জায়গায় নিয়ে আসা হয়, যাতে তারা কাছ থেকে ইতিহাসকে দেখতে ও জানতে পারে। বিশেষভাবে বলতে হয় জার্মানির কথা, যেখানে বিশ্বযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস স্কুলের পাঠ্যবিষয়ের অংশ, এর কারণ একটাই—পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের নির্মমতা ও অনাবশ্যক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বোঝানো, যাতে ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে যে ভুল জার্মানি করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো না হয়।

ওয়ারশর ক্যাসেল স্কয়ার

১৯৪০ সালে ইহুদিদের যে বস্তিতে সরিয়ে আনা হয়েছিল, তার অস্তিত্ব এখন আর না থাকলেও, যে জায়গাতে একসময় দেয়াল ছিল, সেটা পর্যটকদের সুবিধার্থে এখনো আলাদাভাবে দাগ দেওয়া। ঘুরে দেখতে খুব একটা সময় লাগে না, তবে কল্পনা করতে কষ্ট হয় মাত্র ৩ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ৪ লাখ মানুষ কীভাবে জীবন যাপন করত এ কথা ভেবে। ঘরপ্রতি ১০ জন মানুষ, কল্পনা করা যায়? এই ইহুদি জনসংখ্যার ৩ লাখ নিহত হয় বিভিন্ন বন্দিশিবিরে—হয় গুলিতে বা গ্যাস চেম্বারে। ধারণা করা হয়, ৯২ হাজারের মতো মারা যায় ক্ষুধা বা রোগে ভুগে। যদিও ১৯৪৩ সালে ‘বস্তিবাসীরা’ জার্মান সেনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কিন্তু রোগে ভোগা দুর্বল একদল লোক জার্মানির আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে মাথাই তুলতে পারেনি, মারা পড়েছে নির্বিচারে।

সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র আজ অবশ্য প্রায় অচেনা, ওয়ারশে বর্তমান ইহুদি জনসংখ্যা যুদ্ধ–পূর্ববর্তী সংখ্যাকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য হিসেবে যে অর্থ পোল্যান্ডকে দেওয়া হয়েছিল, তার সদ্ব্যবহারের ফল চারদিকে তাকালেই বোঝা যায়। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অসুবিধা না থাকায় প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রায় ১০ মিলিয়ন পর্যটক প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে বেড়াতে আসেন। পর্যটকদের মূল আকর্ষণ ওয়ারশর পুরোনো অংশের একটি চত্বর। কারুকার্যময় স্থাপনাসহ ঐতিহাসিক এই চত্বর যুদ্ধের সময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলেও পরবর্তীকালে পুরোনো ছবি দেখে পোলিশ স্থপতিরা পুরো জায়গাটি আশপাশের বাড়িসহ পুনর্নির্মাণ করেন। চত্বরটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ বোলানোর পর বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে আমি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নয়, বরং দাঁড়িয়ে আছি বর্তমান সময়ে।

ওয়ারশর আরেকটি জায়গার কথা উল্লেখ না করলেই নয়—নাম না–জানা নিহত সৈনিকদের সমাধি। শহরের ঠিক মাঝখানে বিশাল এক জায়গা নিয়ে সমাধিটি দাঁড়িয়ে আছে, যদিও আসল সমাধির জায়গা একেবারেই ছোট, তবে পুরো জায়গাটির পরিধি বিবেচনায় আনলে এর গুরুত্ব বোঝা যায়। সমাধির জায়গাটিতে সব সময় আগুনের শিখা জ্বালানো থাকে আর এখানেই পর্যটকসহ দেশ–বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সম্মান জানাতে আসেন, পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। আমার ইচ্ছে ছিল সমাধির সামনে এক– দুই মিনিট দাঁড়িয়ে নাম না–জানা ওই সব সৈনিকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা অন্য রকম ছিল। আমরা যতক্ষণ সেখানে ছিলাম, তার পুরোটা সময় সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল, প্রথমে ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত, এরপর জর্ডানের রাষ্ট্রদূত—নিরাপত্তার বেড়াজালে কাছেই ভিড়তে পারলাম না! তবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কীভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়, সেই প্রক্রিয়াটি এই ফাঁকে দেখার সুযোগ হয়ে গেল।

আরও কয়েক দিন পর ওয়ারশ শহরকে আমরা বিদায় জানিয়েছিলাম। কিন্তু সেই ভ্রমণের রেশ এখনো রয়ে গেছে, রয়ে গেছে এক অনুপ্রেরণা জাগানিয়া সত্য গল্পের স্মৃতি, যে গল্প দেশটির নির্মম অতীত ও ঘুরে দাঁড়ানোর।

যাঁরা যেতে চান

পুরো পোল্যান্ডই পর্যটনের জন্য বিখ্যাত। তাই দেশটির দরজা সবার জন্য খোলা। সেনজেন ভিসা থাকলে উড়োজাহাজ, বাস, ট্রেন বা গাড়ি—যেকোনোভাবে প্রবেশ করতে পারেন। পর্যটকদের চলাফেরার সুবিধার জন্য এখানে পাওয়া যায় ট্রান্সপোর্ট পাস। ২৪ ঘণ্টা, ৭২ ঘণ্টা কিংবা এক সপ্তাহের পাসও পাওয়া যায়। যেটি দিয়ে আপনি যেকোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্টে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা যতবার খুশি চলাফেরা করতে পারবেন। চলার পথে চোখে পড়বে বিভিন্ন দেশের রেস্টুরেন্ট, থাকার জন্য আছে অনেক হোটেল, হোস্টেল ও এয়ার বিএনবি। হ্যাপি ট্রাভেলস!

রিপ্লাই লিখতে চাই